ঢাকা | ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫ দেশের রাজনীতির এক বর্ণাঢ্য ও দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। মঙ্গলবার ভোরে ফজরের নামাজের কিছুক্ষণ পর এভারকেয়ার হাসপাতালের সিসিইউতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
শেষ মুহূর্তের সঙ্গী যারা
মৃত্যুর সময় হাসপাতালের শয্যাপাশে ছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, যিনি দীর্ঘ ১৭ বছর প্রবাস জীবন কাটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেছেন। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন পুত্রবধূ ডা. জোবায়দা রহমান, নাতনি জাইমা রহমান, ছোট ছেলের বউ শর্মিলা রহমান সিঁথি এবং তাঁর ভাই-বোনসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা।
শারীরিক অসুস্থতা ও শেষ দিনগুলো
বেগম জিয়া দীর্ঘ দিন ধরে লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি ও হার্টের জটিলতায় ভুগছিলেন। গত ২৩ নভেম্বর ফুসফুসে সংক্রমণ ও নিউমোনিয়া নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। ডিসেম্বরের শুরুর দিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশে নেওয়ার প্রক্রিয়া চললেও শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।
এক নজরে বেগম খালেদা জিয়ার কর্মময় জীবন
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল আন্দোলন, সংগ্রাম এবং ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল।
- জন্ম ও শৈশব: ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্ম। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার এবং মা তৈয়বা মজুমদার। ১৯৬০ সালে তিনি তৎকালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
- রাজনীতিতে আগমন: ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর দলের কঠিন সময়ে তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৮৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
- এরশাদবিরোধী আন্দোলন: নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ‘আপসহীন’ ভূমিকা তাঁকে গণমানুষের নেত্রীতে পরিণত করে। দীর্ঘ ৯ বছরের সংগ্রামে তিনি বারবার কারাবরণ ও গৃহবন্দী হলেও মাথানত করেননি।
- প্রধানমন্ত্রিত্ব: ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। পরবর্তীতে ২০০১ সালেও তিনি বিপুল জনসমর্থন নিয়ে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরেন। মোট তিন মেয়াদে তিনি দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
- সংস্কার ও উন্নয়ন: তাঁর শাসনামলে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন, প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি চালু এবং ভ্যাট (VAT) ব্যবস্থা প্রবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হয়।
- শেষ জীবন: ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তিনি কারাবরণ করেন। পরবর্তীতে সরকারের নির্বাহী আদেশে মুক্তি পেলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি দীর্ঘ সময় হাসপাতালে ও গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় নিভৃতে সময় কাটিয়েছেন। ২০২৫ সালের শুরুতেই সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে সব মামলা থেকে খালাস প্রদান করে।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টা, শেখ হাসিনা সহ দেশী বিদেশী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সংগঠন সহ রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন দেশ তার মৃত্যুর খবরে শোকবার্তা প্রদান করেছেন। তাঁর মরদেহ আজ জানাজা ও শ্রদ্ধার জন্য রাখা হবে এবং পরবর্তীতে পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দাফন সম্পন্ন হবে।

