অগ্রহায়ন শেষ হতে না হতেই গ্রামবাংলায় খেজুর রসের সুঘ্রান!
📑 সংবাদ প্রতি প্রহর ডেস্ক:
হেমন্তের শেষলগ্নে অগ্রহায়ণ মাস পেরোতেই বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে শুরু হয়ে গেছে খেজুরের রস আহরণের জোর প্রস্তুতি। শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে আসা এই প্রাকৃতিক মিষ্টান্ন কেবল পিঠা-পুলি তৈরির উপকরণ নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিশাল ভূমিকা রাখে। বাংলার প্রকৃতিতে খেজুর গাছ প্রায় সর্বত্র দেখা গেলেও, যশোর, খুলনা, নাটোর এবং ফরিদপুর অঞ্চল রস ও গুড় উৎপাদনে বিশেষভাবে বিখ্যাত। এই অঞ্চলগুলোতে প্রতি বসরে আনুমানিক ২৫ থেকে ৪০ লক্ষ লিটার পর্যন্ত রস সংগৃহীত হয়, যেখানে অন্যান্য অঞ্চলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে সীমিত আকারে উৎপাদন হয়।

সংগৃহীত খেজুর রস মূলত দুই ধাপে বাজারজাত করা হয়। প্রথমত, ভোরের টাটকা রস সরাসরি পানীয় হিসেবে বিক্রি হয়, যা গ্রাম থেকে শুরু করে শহরাঞ্চলের শীতকালীন সকালের এক বিশেষ আকর্ষণ। দ্বিতীয়ত এবং প্রধানত, এই রসের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ দীর্ঘ সময় ধরে জ্বাল দিয়ে বিভিন্ন প্রকার গুড় তৈরি করা হয়। এর মধ্যে নলেন গুড় (যা নতুন রসের তৈরি ও সুগন্ধযুক্ত), পাটালি গুড় (শক্ত জমাট বাঁধা গুড়) এবং ঝোলা বা লালি গুড় (তরল গুড়) অন্যতম। এই গুড়গুলো দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার, বিশেষ করে মিষ্টি শিল্পে সরবরাহ হয়। এর পাশাপাশি, নলেন গুড়ের মতো বিশেষ পণ্যগুলো উচ্চমূল্যে দেশের বাইরে থাকা প্রবাসী বাঙালি এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানির বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। যশোর অঞ্চলের গুড়ের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির প্রক্রিয়া এই সম্ভাবনাকে আরও উজ্জ্বল করছে।

তবে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো খেজুর গাছের সংখ্যা হ্রাস। দ্রুত নগরায়ণ, ইটভাটা এবং জ্বালানির জন্য যত্রতত্র গাছ কেটে ফেলার কারণে রসের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, লাভের আশায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গুড়ে চিনি মিশিয়ে ভেজাল করায় প্রাকৃতিক গুড়ের সুনাম নষ্ট হচ্ছে এবং ভোক্তারা আস্থা হারাচ্ছেন। তৃতীয়ত, শীতের তীব্রতা কমে যাওয়া বা অসময়ের আবহাওয়া পরিবর্তন রসের পরিমাণ ও গুণগত মানকে প্রভাবিত করছে। সবশেষে, ঐতিহ্যবাহী গাছি পেশায় নতুন প্রজন্মের অনীহা থাকায় দক্ষ গাছিদের অভাব দেখা দিচ্ছে।

এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাপক হারে খেজুর গাছ রোপণ ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। গুড় উৎপাদনে মান নিয়ন্ত্রণ (QC) এবং ভেজাল রোধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া, গাছিদের প্রশিক্ষণ, সরকারি প্রণোদনা এবং উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে গুড়ের সংরক্ষণকাল (Shelf Life) বাড়ানো সম্ভব হলে এই শিল্প দেশের অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

