‘সেলিব্রিটি’ উন্মাদনায় নড়াইলের সামাজিক অবক্ষয়: প্রকাশ্যে অশ্লীলতা!
সংবাদ প্রতি প্রহর প্রতিবেদক, নড়াইলঃ
আধুনিক প্রযুক্তির তথাকথিত আশীর্বাদ ফেসবুক ও টিকটক আজ নড়াইলের নারী, তরুণী ও কিশোরীদের জীবনে এক চরম সংকট তৈরি করেছে। ‘সেলিব্রিটি’ হওয়ার এক উন্মাদনায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এই জনপদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অশালীন, বেপরোয়া এবং ব্যক্তিত্বহীন পথে হাঁটছে। পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের এই অবক্ষয় নড়াইলের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ভয়ংকর অশনি সংকেত।
মনিটাইজেশন ও রাতারাতি তারকা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর বর্তমান প্রজন্ম ভুলে যাচ্ছে নিজেদের আত্মসম্মান ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। তাদের বেপরোয়া জীবনযাপন পরিবারে সৃষ্টি করছে চরম অশান্তি ও কলহ। সেলিব্রেটি হওয়ার প্রতিযোগিতায় বাহারি দামি পোশাক ও অলঙ্কারের চাহিদা মেটাতে গিয়ে পরিবারে অশান্তি বাড়ছে। সামাজিক মাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করার ফলে বহু তরুণী কর্মক্ষেত্র এবং পড়াশোনা থেকে সম্পূর্ণভাবে ছিটকে পড়ছে, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
এসব অশালীন ভিডিও কনটেন্ট তৈরীতে পিছিয়ে নেই গৃহিণী থেকে স্কুল কলেজ পড়ুয়া তরুনী-কিশোরী, কর্মজীবি নারী, গ্রাম-শহরের নারী তরুনী, চিকিৎসক, নার্স, পতিতা, ব্যবসায়ী, চাকুরীজীবি কেউই। কেউ কেউ একক কেউ বন্ধু বান্ধব নিয়ে, কেউবা আবার স্বামী স্ত্রী, প্রেমিক প্রেমিকা নিয়ে অনলাইনে দেদারছে ছাড়ছে অপ্রীতিকর ভিডিও-ছবি। হাস্যরসের নামেও চলছে অশ্লীল বক্তব্য প্রচার, পন্যের প্রচার বা বিপননের নামে চলছে অশালীন শরীর উপস্থাপনের নোংড়া প্রতিযোগীতা।
নারী কিশোরীদের অশালীন অঙ্গভঙ্গি, প্ররোচনাপূর্ণ ভিডিও-ছবিতে আকৃষ্ট হয়ে এবং লাইক-কমেন্টের প্রলোভনে পড়ে অনেকে অনৈতিক সম্পর্কে জড়াচ্ছে অনেকেই, যা সামাজিক মূল্যবোধ ও অবকাঠামোকে দুর্বল করে দিচ্ছে। প্রেম-পরিণয় সংক্রান্ত হতাশা, হিংস্রতা এবং সামাজিক অসম্মান থেকে সৃষ্ট মানসিক চাপে অসংখ্য কিশোর-কিশোরী আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে বা প্রাণ হারাচ্ছে।
নড়াইল শহরের গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল স্থানগুলি আজ এই অশালীন কার্যকলাপের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রশাসন বা সমাজপতিদের কোনো প্রকার বাধা ছাড়াই প্রকাশ্যে চলছে ভিডিও স্যুট, যা সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকদের জন্য চরম বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে।
শহরের বাঁধাঘাট, রাসেল সেতু, সুলতান মঞ্চ, হাটবাড়িয়া পার্ক, চিত্রা রিসোর্ট, রেল স্টেশন, রামকৃষ্ণ আশ্রম, চিত্রা সেতু, ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট সহ বিভিন্ন পয়েন্টে প্রকাশ্যে এই ধরনের কার্যকলাপ চলছে যার অধিকাংশই বিব্রতকর ও আপত্তিজনক। প্রকাশ্য স্থানে এই ধরনের আচরণ সাধারণ মানুষের জন্য অস্বস্তিকর এবং এতে যুবসমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে অভিভাবকেরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব, দ্রুত অর্থ উপার্জন এবং খ্যাতি লাভের লোভই এই পরিস্থিতির মূল কারণ।
”ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিঃসন্দেহে সুযোগ এনেছে, কিন্তু এর অপব্যবহার পুরো সমাজকে গিলে খাচ্ছে। সুস্থ বিনোদন এবং শিক্ষামূলক কনটেন্ট তৈরির দিকে তরুণদের মনোনিবেশ করানো জরুরি। পাশাপাশি, পারিবারিক বন্ধন ও তদারকি জোরদার করা অপরিহার্য।”
নড়াইলের সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি বলে মতামত জানান সচেতন নাগরিক ও সমাজ সচেতনরা।
সন্তানদের প্রযুক্তি ব্যবহারের সময়সীমা ও কনটেন্টের বিষয়ে অভিভাবকদের নিয়মিত তদারকি করতে হবে।
স্থানীয় সমাজপতি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে প্রযুক্তির অপব্যবহারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতামূলক সেমিনার ও ক্যাম্পেইন আয়োজন করতে হবে।
জনবহুল স্থানে অশালীন কার্যকলাপ বন্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ইতিবাচক বিকল্পের সুযোগ তৈরি করা।
মনিটাইজেশনের নামে টিকটক, ফেসবুকের এই উন্মাদনা নড়াইলের সামাজিক মূল্যবোধের জন্য এক চরম পরীক্ষা। সমাজের সকল স্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এই অবক্ষয় রোধ করে একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক সমাজ ফিরিয়ে আনতে।

