দুর্ধর্ষ কিশোর গ্যাং “আশিক গ্রুপের” অত্যাচারে অতিষ্ট খুলনা নগরবাসী, পুলিশ-সেনা-যৌথবাহিনী উদাস!
বিশেষ প্রতিবেদনঃ
খুলনা মহানগর পুলিশের তালিকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী কিশোর গ্যাং ‘আশিক’ গ্রুপের সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে অতিষ্ট ও শঙ্কিত নগরবাসী। বেপরোয়া হত্যা ছিনতাই ডাকাতি করার পর কিছুদিন আত্মগোপনে থেকে আবারো আরো ভয়ংকর রুপে ফিরেছে তারা।
চরম চাপে পড়ে ২০২৪ সালে এই বাহিনীর একজন শুটারকে আটক করেছিলো কেএমপির ডিবি পুলিশ। গ্যাং প্রধান আশিকের বড় ভাই সজিবও বিপুল পরিমান ইয়াবাসহ আটক হয়। তবে বয়সের সুযোগ নিয়ে ও বাদীপক্ষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে খুব সহজেই জামিনে ছাড়া পেয়ে আবারো ফিরে এসে ভয়ংকর রুপে ফিরে এসেছে তারা।

খুন, চাঁদাবাজি, ধর্ষন, ইভটিজিং, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক, ডাকাতি, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার -ক্রয় -বিক্রয়, জমি দখল, অপহরণ-মুক্তিপন আদায় সহ ‘আশিক’ এর নেতৃত্বে এমন কোন অপরাধ নেই যা করে না এ বাহিনীর সদস্যরা। আন্তর্জাতিক মাফিয়া ডনদের মতো এই বাহিনী প্রধান আশিক আত্মগোপনে থেকেই পরিচালনা করছে সকল অপরাধ কার্যক্রম।
কেএমপি’র ডিবি পুলিশ জানায়, খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী আশিক গ্রুপ এর সহযোগী ও শুটার মো: ইব্রাহিম শিকদারকে আটক করেছিলো মহানগর ডিবি পুলিশ।

২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর রাত সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর ডিবি ওসি তৈমুর ইসলামের নেতৃত্বে একটি টিম খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে থেকে তাকে গ্রেফতার করে। সে খুলনা সদর থানাধীন নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা আফজাল শিকদারের ছেলে। একটি মাদক মামলায় তার সাজাও হয়। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় হত্যা, মাদকসহ বিভিন্ন মামলা রয়েছে। সে খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী আশিক এর সহযোগী ও শুটার এবং মাদক ব্যবসা দেখাশুনার দায়িত্বে নিয়োজিত। এর আগে যৌথবাহিনী গত অক্টোবর মাসে বাহিনীর প্রধান আশিকের ভাই সজিব ইসলামকে এক হাজার ৬১৭ পিস ইয়াবাসহ আটক করেছিল। সে সময় তার কাছ থেকে ইয়াবা বিক্রির ১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা, ২১টি মোবাইল সেট, ১টি ল্যাপটপ, ৫টি সিসি ক্যামেরা এবং ১টি রামদা উদ্ধার করে। পরে তার দেয়া স্বীকারোক্তিতে তার মা জুলেখা বেগম ও ৩ সহযোগীও আটক হয়।

সহযোগিরা হচ্ছে ফয়েজ রাব্বী, ইয়াকুব ও জিয়াউল ইসলাম জিয়া। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে নগরীর বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। আর সজিবের বিরুদ্ধে নগরীর বিভিন্ন থানায় ১১টি মামলা রয়েছে। নগরীর ৩০, ৩১ ও ২২নং ওয়ার্ড এলাকায় মাদক বিক্রিসহ বিভিন্ন অপরাধের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে আশিক বাহিনী। আটক সজীব তার ভাই এবং অপরাধের অন্যতম সহযোগী। এছাড়া ২০২৩ সালের ১ আগস্ট খুলনার রূপসা সেতু টোল প্লাজা থেকে ৯ হাজার ৩৫০ পিস ইয়াবাসহ সজীবকে গ্রেফতার করেছিল র্যাব। ওই সময় র্যাব জানিয়েছিল, চট্টগ্রাম থেকে মাদকের বড় বড় চালান এনে খুলনা শহরে তা বিক্রি করে চক্রটি। ওই মামলায় কিছুদিন কারাভোগের পর জামিনে বের হয় সজীব। আশিক এখন পর্দার অন্তরালে থাকলেও সজীব খুলনায় প্রকাশ্যেই মাদকের কারবার চালিয়ে আসছিল। সজিব ও আশিক ক্রয়ফায়ারে নিহত সুন্দরবনের বনদস্যু জুলফিকার আলী ওরফে জুলফির ছেলে। এখন সজিবের ভাই আশিক ইসলাম নগরীর ভয়ঙ্কর কিশোর গ্যাং ‘আশিক গ্রুপ’-এর প্রধান।

কেএমপির বিশেষ শাখার তালিকায়, খুলনা শহরের বর্তমানে সব থেকে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে আশিক গ্রুপ। ওই বাহিনীর প্রধান আশিক নিজ নামে দলটি গঠন করেছে। সে খুলনা মহানগরীর সদর থানাধীন চানমারী এলাকার বাসিন্দা। ২০১৮ সালে ৬ সেপ্টেম্বর প্রথম হত্যা মামলায় জড়িয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে যুক্ত হন। এ পর্যন্ত তার নামে বিভিন্ন থানায় কমপক্ষে ১১ টি মামলা হয়েছে। তার দলে অস্ত্রধারী সদস্য রয়েছেন অন্ততঃ ১৫০ জন। এখন পর্যন্ত তাদের নামে মোট অন্ততঃ ১৩২টি মামলা রয়েছে। আশিক গ্রুপের প্রধান সহকারী ফয়সাল। সে খুলনা সদর থানাধীন দক্ষিণ টুটপাড়া এলাকার বাসিন্দা। ২০১৬ সালে সেও হত্যা মামলায় জড়িয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে যুক্ত হন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে আশিকের গ্রুপের সঙ্গে কাজ শুরু করে। তার নামে এ পর্যন্ত বিভিন্ন থানায় ৯ টির বেশি মামলা হয়েছে। এ ছাড়া ওই গ্রুপের সদস্য আব্দুল্লহ, জাহিদুল ইসলাম, বস মিজান, পালসার সোহেল, কাউট বাসার, হেলাল, পারভেজ, দুলাল, নাদিম, ডালিম, অপু, জিহাদ হোসেন জিয়ার, মো: সাগর লেলিন, শেখ গোলাম মোস্তফা ওরফে ট্যারা মোস্ত, আরমান, সাইফুল ইসলাম পিটিল, মো: ইয়াছিন, মো: নিয়াজ মোর্শেদ, স্পিকার মিরাজ ও শেখ বাবুল। এদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। মামলাগুলোর মধ্যে হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবসা ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় রয়েছে।
গত আনুমানিক ৫ মাস আগেও আশিক গ্রুপ অর্ধশতাধিক মোটর সাইকেলে অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়ে খুলনা মহানগরের টুটপাড়া ৩০ নং ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার আমান মোল্যার ভাই বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বোয়িং মোল্যাকে তারই বাড়ির সামনে প্রকাশ্যে সিনেমা স্টাইলে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আশিক গ্রুপের প্রধান আশিকের বয়স মাত্র ২৯ বছর। ৯ বছর আগে এলাকার কিশোরদের নিয়ে সে গ্যাং সৃষ্টি করে মহড়া দিয়ে বেড়াতো। পরে কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে হত্যাকান্ডে জড়িয়ে পড়ে, কন্ট্রাক কিলার হিসাবেও টাকার বিনিময়ে বেশ কয়েকটি হত্যাকান্ড চালায় তারা। এক পর্যায়ে ওই এলাকায় মাদক ও পরবর্তীতে অস্ত্র বিক্রি শুরু করেন। ধীরে ধীরে এলাকার জমি ব্যবসায়ীরা তাকে ভাড়ায় নিয়ে বিভিন্নজনের জমি দখল শুরু করে। বর্তমানে খুলনা শহরের শীর্ষ মাদক সরবরাহকারীও আশিক গ্রুপ। আশিক এখন পর্দার অন্তরালে থাকলেও, তার বড় ভাই সজিব প্রকাশে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। এ ব্যাপারে পুলিশের একজন কর্মকর্তা এ প্রতিনিধিকে বলেন, আমরা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কিছু বাড়িতে তল্লাসী ও কিছু কিছু এলাকার কয়েকটি স্থান সিল করেছি। আমাদের বিশেষ অভিযান অব্যাহত আছে । আসামী ধরতে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।”
তবে আশিক গ্রুপের অসহনীয় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অতিষ্ট ও শঙ্কিত নগরবাসীর অভিযোগ- প্রশাসন এদের বিরুদ্ধে রহস্যজনকভাবে নির্বিকার রয়েছে। কিশোর গ্যাংএর সদস্যরা প্রকাশ্যে আড্ডাবাজী করে, কে কখন কি করছে না করছে সব সাধারণ জনগন দেখছে বা জানে, অথচ পুলিশ নাকি তাদের খুজেই পায় না!
সেনা-পুলিশ-যৌথ বাহিনীর রহস্যজনক আচরণে উদ্বিগ্ন ও আতঙ্কিত খুলনা নগরবাসী।

